প্রতিবেদক : মোঃ সাইদুজ্জামান সাঈদ
সীমান্তঘেঁষা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি যেন ক্রমেই মাদক পাচারের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রুটে পরিণত হচ্ছে। দুর্গম পাহাড় ঘন জঙ্গল ছড়া ও সীমান্তের অপ্রচলিত পথ ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা বিদেশি মদসহ বিভিন্ন চোরাই পণ্য দিনের আলোয় অনেকটা নীরব থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয় বহনকারী দালাল ও পাহারাদাররা সুযোগ বুঝে গভীর রাতে ঢুকে পড়ে মাদকের চালান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সীমান্ত এলাকার একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, সোনাইছড়ি, ফুলতলী, জারুলিয়াছড়ি,রামু কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া ও দোছড়ি আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মাদক পাচারের একাধিক রুট সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব রুটের কয়েকটি দিয়ে নিয়মিত ইয়াবা ও বিদেশি মদের চালান আসার অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। সীমান্ত পার হওয়ার পর ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে এগোয় বহনকারীরা। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে চালান চলে যায় কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
আগস্টজুড়ে অভিযানে সাড়ে ১১ লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের চিত্রও বলছে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাদক পাচারের পরিমাণ উদ্বেগজনক। শুধু আগস্ট মাসেই উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ এলাকায় কয়েক দফা অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে।
এর মধ্যে ৪ আগস্ট ফুলতলী এলাকায় ৯০ পিস ইয়াবা ও এক লিটার বাংলা মদসহ একজনকে আটক করা হয়। ৫ আগস্ট জারুলিয়াছড়ি এলাকায় ৮৯ হাজার ৯১৬ পিস ১০ আগস্ট ঘুমধুমের নয়াপাড়া সীমান্তে ২ লাখ ৪৬ হাজার পিস।১১ আগস্ট ঘুমধুমের জামালের ঘের এলাকায় ৩৯ হাজার ৯২৪ পিস ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে বিজিবি। একই দিন বাইশারীতে ১০০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে আটক করে পুলিশ ১১ আগস্ট আম্মাজান কমিউনিটি সেন্টারসংলগ্ন এলাকায় ৩০ হাজার ১০০ পিস, একই রাতে ঘুমধুমের জামালের ঘের এলাকায় ৩৯ হাজার ৯২৪ পিস ১৫ আগস্ট ২ লাখ ১০০ পিস, ১৬ আগস্ট ঘুমধুম সীমান্তে ২ লাখ পিস, ২০ আগস্ট শিলেরঝিড়ি এলাকায় ৪৯ হাজার ৯৮২ পিস এবং পরবর্তী সময়ে আরও কয়েক দফা অভিযানে হাজার হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ২৪ আগস্ট বাইশারীতে ২১৫ পিস ইয়াবা, ১০ পুরিয়া গাঁজা ও মাদক বিক্রির ৪ হাজার ৯৫০ টাকা উদ্ধারসহ মো. রুহুল আমিন (৩৮) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৮ আগস্ট ঘুমধুমের মন্ডলপাড়া এলাকায় ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক এফডিএমএন সদস্যকে আটক করে বিজিবি।
সর্বশেষ জারুলিয়াছড়ি এলাকায় মাটির নিচে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে র্যাব-১৫। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলম (৪২) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানগুলোর তথ্য যোগ করলে আগস্ট মাসে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিমাণ সাড়ে ১১ লাখ পিসের বেশি। এত বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও প্রশ্ন উঠছে উদ্ধার হওয়া এসব চালানের পেছনে কারা? সীমান্ত পার করার পর কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এসব চালান। শুধু বহনকারীরাই কি পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। নাকি তাদের পেছনে রয়েছে অর্থদাতা ও প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক।
১০ সীমান্ত পয়েন্টে রাতের তৎপরতার অভিযোগ
নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলোই পাচারকারীদের বড় ভরসা বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। যে রুট দিয়ে নিয়মিত ইয়াবার পাচার হয় সোনাইছড়ি, ঘুমধুম,সদর ইউনিয়নে চাকঢালা আশারতলী,জারুলিয়াছড়ি,কম্বনিয়া,চেরারকুল,রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের হাজির পাড়া,বালুবাসা,ডাক্তার কাটা,মৌলভীকাটা,দোছড়ি,তিতারপাড়া,
গর্জনিয়া ইউনিয়নে, ক্যাজরবিল,সিকদার পাড়া,থিমছড়ি,বড়বিল,জুমছড়িসহ আরো অনেক পাহাড়ি পথ রয়েছে।
সীমান্তের অন্তত ৭ থেকে ১০টি পয়েন্ট মাদক পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও সীমান্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। কোনো পয়েন্ট পাহাড়ি ছড়ার পাশে, কোনোটি ঘন জঙ্গলে, আবার কোনোটি লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে নিয়মিত নজরদারি চালানো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
সীমান্তসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, দিনের বেলায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চালান নিয়ে দর-কষাকষি চলে। রাত গভীর হলে নির্ধারিত পয়েন্ট দিয়ে চালান পার করা হয়। বাংলাদেশে প্রবেশের পর বহনকারীরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সোনাইছড়ি সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্টে গভীর রাতে মাদকের কেনাবেচা হয়। অন্তত চারটি রুট দিয়ে ইয়াবা ও বিদেশি মদ ঢোকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব রুট ও অভিযোগের প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দেড় শতাধিক কারবারি, বহনকারী কয়েক হাজার দাবি স্থানীয়দের
সীমান্তবর্তী ঘুমধুম,সোনাইছড়ি, কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দেড় শতাধিক সক্রিয় মাদক কারবারি রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকটি সূত্র। তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে বিপুলসংখ্যক বহনকারী। পাহাড়ি পথ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা দরিদ্র ও বেকার যুবকদের একটি অংশকে অল্প টাকার বিনিময়ে বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কেউ পাহাড় থেকে চালান নিয়ে আসে, কেউ নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়। আবার কেউ পরিবহন কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। ফলে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক শুধু মাদক কারবারিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে স্থানীয়ভাবে একটি সহযোগী কাঠামো তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সীমান্ত এলাকার তরুণদের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদে অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অস্ত্রধারীদের পাহারায় পাচার
সীমান্ত এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, মাদকের চালান পরিবহনের সময় কারবারিদের সঙ্গে সশস্ত্র সহযোগীরাও থাকে। কোনো ধরনের বাধা বা সন্দেহের সৃষ্টি হলে তারা ভয়ভীতি দেখায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের এক বিএনপি নেতা বলেন, “প্রতি রাতেই গুলির শব্দ শুনতে পাই। সাধারণ মানুষ এখন আতঙ্কে থাকে। সীমান্তে কী হচ্ছে, সবাই জানে; কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
১০ আগস্ট ঘুমধুম সীমান্তের নয়াপাড়া এলাকায় বিজিবির অভিযানে একটি বিদেশি অস্ত্র, পাঁচ রাউন্ড গুলি ও ২ লাখ ৪৬ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি অবশ্য সীমান্তে মাদক পাচারের সঙ্গে অস্ত্রের উপস্থিতির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় কিছু মাদক কারবারি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও অভিযান হলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আবারও একই কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে কারা রাজনৈতিক ছত্রছায়া দিচ্ছেন এমন নির্দিষ্ট অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম নথি বা আদালত-সমর্থিত তথ্য এই পর্যায়ে পাওয়া যায়নি।
কয়েকজন গডফাদারের নিয়ন্ত্রণে দাবি স্থানীয়দের
সোনাইছড়ি সীমান্তের কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সীমান্তের মাদক কারবার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে বহনকারী ও ছোটখাটো কারবারিরা আটক হলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একেকটি চালানে যখন লাখ লাখ ইয়াবা সীমান্ত পার হচ্ছে, তখন এত বড় চালানের অর্থের জোগানদাতা, ক্রেতা, পরিবহনকারী ও গন্তব্যস্থলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কারা? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
অভিযানে ধরা পড়ছে বহনকারী, বড় কারবারিরা কোথায়
আগস্টের অভিযানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ঘটনায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হলেও কাউকে আটক করা যায়নি। আবার কিছু ঘটনায় বহনকারী কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
অন্যদিকে লাখ লাখ ইয়াবার কয়েকটি চালানে কাউকে আটক করা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—চালান উদ্ধারের পরও কেন মূল হোতারা অধরা?
বিজিবি বলছে, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে
নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়ন (১১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়জুল কবির বলেন, সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতেও বিজিবির টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম পিএসসি বলেন, সীমান্তে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। কঠোর অভিযানের কারণে কোটি কোটি টাকার মাদক জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরো জানান সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন মাদক চাঁদাবাজি ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। তিনি বলেন মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে থানা পুলিশ তৎপর। মাদকের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু ইয়াবা উদ্ধার নয়, ভাঙতে হবে পুরো নেটওয়ার্ক
নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তে ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ দিচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তপথে মাদক পাচারের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
স্থানীয়দের মতে শুধু বহনকারী আটক কিংবা চালান উদ্ধার করে এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সীমান্ত পারাপারের পর মাদকের গন্তব্য স্থানীয় দালাল অর্থদাতা পরিবহনকারী এবং মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা জরুরি। কারণ একটি চালান সীমান্ত পার হতে হলে একাধিক ধাপে মানুষ, অর্থ ও যোগাযোগের প্রয়োজন হয়।
তাই এখন মূল প্রশ্ন নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়ি সীমান্তে লাখ লাখ ইয়াবা আসছে কার নির্দেশে, কার অর্থে এবং শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে?


