“রামু সহিংসতা বিচারহীনতায় ১৪ বছর,
২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ — একটি বেদনাবিধুর স্মৃতি”
২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২। বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ইতিহাসে দিনটি এক গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে। কক্সবাজারের রামুতে সেদিন রাতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতবাড়ি ও বৌদ্ধ বিহারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে এই সহিংসতার অভিঘাত কক্সবাজারের উখিয়া,চট্টগ্রামের পটিয়ার কিছু এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কথিত ধর্মীয় অবমাননাকর ছবি/পোস্ট ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে রামুর বিভিন্ন বৌদ্ধপল্লি ও বিহারে হামলা চালানো হয়। বহু ঘরবাড়ি, বৌদ্ধ বিহার ও ধর্মীয় নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু মানুষ রাতারাতি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন।
রামুর বৌদ্ধ বিহারগুলো শুধু উপাসনার স্থান ছিল না- এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শত বছরের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। আগুন ও ধ্বংসযজ্ঞে সেই ঐতিহ্যেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। পুড়ে যায় ধর্মীয় গ্রন্থ, বুদ্ধমূর্তি ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এটি শুধু সম্পদ হারানোর ঘটনা নয়,নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাতের এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
১৪ বছর পরও কেন স্মরণ..?
২৯ সেপ্টেম্বর ফিরে এলে রামুর সেই রাতের স্মৃতি আবারও সামনে আসে। এই স্মরণ কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য নয়, বরং অতীতের সহিংসতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বেদনা স্মরণ করা এবং ভবিষ্যতে যেন ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে আর কোনো সহিংসতার ঘটনা না ঘটে—
এই প্রত্যাশার জন্য।
একটি শান্তিপূর্ণ সমাজে কোনো মানুষের ধর্মীয় পরিচয়, উপাসনালয় কিংবা ধর্মীয় অনুভূতি সহিংসতার লক্ষ্য হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গুজব, অপমানজনক বা উসকানিমূলক বিষয় ছড়িয়ে পড়লে তার সত্যতা যাচাই না করে প্রতিক্রিয়া দেখানো আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বিচারহীনতার প্রশ্ন:
রামু সহিংসতার ১৪ বছর পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মনে সেই রাতের স্মৃতি ও বেদনা এখনও অম্লান। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দায়ীদের জবাবদিহির প্রশ্নও তাই স্মরণে আসে।
একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজে প্রত্যেক মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়া এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মানুষের আস্থা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১৪ বছর পরও সেই বেদনাবিধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রত্যাশা—
ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার সবার।
সহিংসতা নয়, সম্প্রীতিতেই হোক প্রিয় বাংলাদেশ।
~তিষ্যানন্দ ভিক্ষু,
সভাপতি- “আমরা কক্সবাজার বৌদ্ধ তরুণ-তরুণী” সংগঠন।


