রবিউল হোছাইন বাবু :
“আমায় কখনো ছেড়ে যাবে না বলেও কেন চলে গেলে তুমি?”— এই আকুতি কোনো উপন্যাসের কাল্পনিক সংলাপ নয়। এটি এক সদ্য বিবাহিত তরুণীর বুকফাটা আর্তনাদ। মাত্র ছয় মাস আগে যে হাতে লেগেছিল বিয়ের রঙিন মেহেদি, আজ সেই হাত দিয়েই স্বামীকে চিরবিদায় জানাতে হচ্ছে তাকে।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নে এখন শুধুই কান্নার রোল। নিথর হয়ে পড়ে থাকা তরুণ ইউছুফের মরদেহের পাশে বসে এভাবেই ভাগ্যকে দোষছেন তার স্ত্রী জান্নাত আক্তার। পাশে বসে একমাত্র ছোট ছেলেকে হারিয়ে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ মা-ও বুক চাপড়ে কাঁদছেন। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, যে ঘরে কিছুদিন আগেও ছিল বিয়ের সানাই আর আনন্দ, আজ সেখানে শুধুই চারপাশের মানুষের আহাজারি।
হারিয়ে গেল ২২ বছরের এক তাজা প্রাণ
নিহত এই তরুণের নাম ইউছুফ। বয়স হয়েছিল মাত্র ২২ বছর। তিনি কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের লট উখিয়ার ঘোনার বাসিন্দা জান্নাত উল্লাহর ছোট ছেলে। রামু খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ২০২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন ইউছুফ।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এক অজানা অসুস্থতার সাথে লড়াই করছিলেন এই প্রাণবন্ত তরুণ। কিন্তু গত শুক্রবার বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোক করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। থমকে যায় একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ, ভেঙে চুরমার হয়ে যায় একটি পরিবারের আজন্মের স্বপ্ন।
ইউছুফের এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার সহপাঠী ও বন্ধুরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেন রূপ নিয়েছে এক শোকের সাগরে। বন্ধুদের টাইমলাইন জুড়ে শুধুই ইউছুফের স্মৃতি আর হারিয়ে ফেলার হাহাকার। একজন বিনয়ী আর সদালাপী বন্ধুকে হারিয়ে স্তব্ধ পুরো ‘২১-এর ব্যাচ।
প্রিয় ইউছুফকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে রামুর সর্বস্তরের মানুষ ছুটে আসেন তার গ্রামের বাড়িতে। অশ্রুসিক্ত নয়নে সবাই বিদায় জানান এই তরুণকে।
গ্রামের বাড়িতে প্রথম জানাজা শেষে ইউছুফের মরদেহ নিয়ে আসা হয় রামু উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর অশ্রু আর ভালোবাসায় ভেজা চোখে উপজেলার কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাকে চিরশায়িত করা হয়।
ইউছুফ চলে গেছেন ওপারে, রেখে গেছেন তার মাত্র ছয় মাসের সংসার আর কখনো না ফুরানো কিছু স্মৃতি। আর জান্নাতের কানে এখনো হয়তো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই না রাখা প্রতিশ্রুতি— “আমায় কখনো ছেড়ে যাবে না…”।


