প্রতিবেদক : উচ্ছ্বাস বড়ুয়া
২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। কক্সবাজারের রামুসহ আশপাশের এলাকায় হঠাৎ নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ তাণ্ডব। উসকানিমূলক গুজবের জেরে একযোগে হামলা চালানো হয়েছিল শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ বিহার, মন্দির এবং নিরীহ মানুষের ঘরবাড়িতে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বৌদ্ধ বিহার, পল্লী ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ সহ লুট করা হয়েছিল মহামূল্যবান বুদ্ধমূর্তি।
সেই হৃদয়বিদারক তাণ্ডবের এক যুগেরও বেশি সময় পার হতে চলেছে। সময়ের আবর্তে সরকার বদলেছে, একের পর এক আশ্বাস ও বিচারিক প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে থমকে আছে পুরো বিচার প্রক্রিয়া। ফলে বিচারহীনতার এক যুগ পার করে এখনও সরকারের আশ্বাসের ওপরই দিন কাটাচ্ছেন পুরো একটি জাতি।
২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বরের সেই কালো রাতে কেবল রামুতেই উসকানিমূলক গুজবের জেরে একযোগে ১২টি ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ বিহার এবং ২৬টিরও বেশি বসতঘর পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়। এছাড়া আংশিক ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতি করা হয় আরও ৬টি বৌদ্ধ বিহার ও বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি। পরবর্তীতে এই সহিংসতার প্রভাব পাশের উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ার বৌদ্ধ পল্লীগুলোতেও গিয়ে পড়ে।
সরকারি ও স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, সেই তাণ্ডবে আগুনে ছাই হয়ে যায় শত শত বছরের পুরনো অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, তালপাতায় লেখা প্রাচীন বিরল বর্মী ও পালি ভাষার পবিত্র ধর্মগ্রন্থ এবং পিতল, কাঠ ও পাথরের অসংখ্য বিরল বুদ্ধমূর্তি। একইসাথে বিভিন্ন বিহার ও বাসাবাড়িতে চালানো হয় ব্যাপক লুটপাট। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল কোনো স্থাপনায় হামলা ছিল না, বরং পুরো এলাকার শত বছরের আবহমান ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির ওপর এক নির্মম আঘাত ছিল।
মামলাগুলোর আইনি প্রেক্ষাপট ও বর্তমান স্থবিরতা নিয়ে কথা বলেন কক্সবাজার জজ কোর্টের আইনজীবী শিপ্ত বড়ুয়া। তিনি বলেন, ঘটনার পর বহু বছর পার হয়ে গেলেও মামলাগুলোর বিচারিক কাজে কোনো গতি দৃশ্যমান নয়। সঠিক তদন্তের অভাব, চার্জশিটের দুর্বলতা এবং সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারার কারণে পুরো বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। এতে করে আইনি কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা চরম ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে জানান, তৎকালীন সময় থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচার পাওয়ার নতুন আশা জাগানো হয়েছিল। কিন্তু এক যুগ পরেও কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তারা আজ দিশেহারা। বিচার পাওয়ার অপেক্ষা করতে করতে আজ তাদের কাছে সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো কেবলই ‘কাগজে-কলমে আশ্বাস’ হিসেবে রয়ে গেছে।
ঘটনাটিকে রামুর আবহমান কাল ধরে চলে আসা অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
এ বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও রামু উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী ডা. মোহাম্মদুল হক জনি বলেন, ঘটনাটি আমাদের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। রামু একটি সম্প্রীতির শহর, এখানে আমরা বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ নানা জাতের মানুষ যুগ যুগ ধরে মিলেমিশে বসবাস করে আসছি। আমার মনে হয় আমাদের এই বন্ধন ও সম্প্রীতি নষ্ট করতেই রাজনৈতিকভাবে সুপরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল। তবে আমি রামুসহ ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ সমাজকে জানাতে চাই, আমরা অতি শীঘ্রই সরকারের প্রতিনিধিগণের কাছে আবেদন জানাব মামলাগুলো যাতে নতুনভাবে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে প্রকৃত আসামিদের শাস্তির আওতায় আনা হয়।
আইনবিদ, মানবাধিকার কর্মী এবং স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, পুরনো ভুলত্রুটি কাটিয়ে নিরপেক্ষ ও নতুন তদন্তের মাধ্যমে মূল পরিকল্পনাকারী এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। রামুর শত বছরের ধর্মীয় সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখতে এবং ভুক্তভোগী মানুষের ক্ষোভ প্রসমিত করতে আর কোনো আশ্বাস নয়, দ্রুত বিচার দৃশ্যমান করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


