উচ্ছ্বাস বড়ুয়া বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার একজন তরুণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সাহসী, জনস্বার্থভিত্তিক এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করেছেন। ২০০৩ সালের ৫ এপ্রিল কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার ফতেখারকুল ইউনিয়নের হাজারীকুল গ্রামে তার জন্ম। শৈশব থেকেই সমাজ, মানুষ এবং চলমান ঘটনাবলীর প্রতি তার আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই পরবর্তীতে তিনি সাংবাদিকতাকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং খুব অল্প সময়ে কক্সবাজারের সংবাদ অঙ্গনে একটি আলোচিত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
শিক্ষাজীবনে উচ্ছ্বাস বড়ুয়া কক্সবাজার পৌর প্রিপারেটরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে ২০২৩ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত রয়েছেন। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সাংবাদিকতার প্রতি তার আগ্রহ ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং তিনি মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে সংবাদ সংগ্রহ ও অনুসন্ধানী কাজ শুরু করেন।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে তার সাংবাদিকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তিনি কক্সবাজারের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম দৈনিক আজকের কক্সবাজার বার্তা এবং প্যানোয়া নিউজে সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সাংবাদিকতায় প্রবেশের পর থেকেই তিনি সাধারণ সংবাদ পরিবেশনের চেয়ে অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের দিকে বেশি মনোযোগ দেন। দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আর্থিক প্রতারণা, পরিবেশ ধ্বংস, নিখোঁজের ঘটনা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে থাকেন।
প্যানোয়া নিউজের হয়ে কাজ করার সময় তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা BBC Media Action-এর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। প্রায় দেড় বছর ধরে চলা এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি জনস্বার্থ সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং আধুনিক সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি জনস্বার্থ সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কাজ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি রামু ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়ন, অপরাধভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীলতা এবং তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা চর্চায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে অনেকের মতে, উচ্ছ্বাস বড়ুয়ার সাংবাদিকতায় পদার্পণের পর রামু অঞ্চলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। তার আগমনের আগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অনিয়ম এবং অভিযোগ জনসম্মুখে খুব কমই আসত বলে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন। সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার পর তিনি ধারাবাহিকভাবে এমন সব প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকেন, যা বিভিন্ন গোপন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং আলোচিত ঘটনাকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে। ফলে তিনি দ্রুতই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিভিন্ন মুখোশ উন্মোচনের জন্য পরিচিতি লাভ করেন।
উচ্ছ্বাস বড়ুয়ার সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম আলোচিত অনুসন্ধানী কাজ ছিল কক্সবাজার জেলার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন। কক্সবাজারের নাম যার নামে রাখা হয়েছে বলে প্রচলিত রয়েছে, সেই ব্রিটিশ কর্মকর্তা হিরাম কক্সের নামে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটি প্রতিকৃতি বা ছবির সত্যতা নিয়ে তিনি অনুসন্ধান শুরু করেন। প্যানোয়া নিউজে প্রকাশিত তার অনুসন্ধানী ভিডিও প্রতিবেদনে তিনি তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে দাবি করেন যে বহুল ব্যবহৃত ছবিটি প্রকৃতপক্ষে হিরাম কক্সের নয়। এই প্রতিবেদন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে রামুর ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স বাংলোতে ব্যবহৃত ওই ছবিটি প্রশাসন সরিয়ে নেয় বলে জানা যায়। স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে এটি তার অন্যতম আলোচিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাংবাদিকতা জীবনে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— “তিন মাসেও মেলেনি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট: মামলা নেয়নি পুলিশ”, “কয়েক মিনিটের জন্য বের হয়ে এক বছরেও ফিরেনি জয়”, “বনভূমির রক্ষক যখন ভক্ষক হয়”, “ইসলামী ব্যাংকের এটিএম থেকে জাল নোট” এবং “পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে ঋণের নামে ভয়াবহ প্রতারণা”। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা, প্রশাসনিক অনিয়ম, মানবিক সংকট এবং আর্থিক দুর্নীতির বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তাকে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিরও মুখোমুখি হতে হয়েছে। রামুর পূর্ব মেরংলোয়া এলাকায় এক বৃদ্ধ হত্যাকাণ্ডের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন বলে জানা যায়। ঘটনাস্থলে ভিডিও ধারণের সময় কিছু ব্যক্তি তার কাজে বাধা দেয় এবং তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় তার মোবাইল ফোনে ধারণ করা ফুটেজও মুছে ফেলা হয় বলে জানা যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তার দায়ের করা মামলার প্রধান আসামী প্রান্ত বড়ুয়া ওরফে ডংগ্লসকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এছাড়াও রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ার ঘোনা এলাকায় ডাকাত মালেকের ডেরায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন বলে জানা যায়। ঝুঁকি, ভয়ভীতি এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তিনি সংবাদ সংগ্রহ ও অনুসন্ধানী কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণে স্থানীয়ভাবে একজন সাহসী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।
সাহসী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ উচ্ছ্বাস বড়ুয়া বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন এবং পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সংবাদ সংগ্রহ এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য তিনি এসব স্বীকৃতি অর্জন করেন।
উচ্ছ্বাস বড়ুয়ার সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হলো সত্য উদঘাটন করা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সামনে আনা এবং সমাজের অসঙ্গতি ও অনিয়ম প্রকাশ করা। তরুণ বয়সেই তিনি যে সাহস, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা তাকে কক্সবাজারের সাংবাদিকতা অঙ্গনে একটি পরিচিত ও আলোচিত মুখে পরিণত করেছে। সাংবাদিকতা ও শিক্ষাজীবন সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এই তরুণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর পরিসরে কাজ করবেন—এমন প্রত্যাশা তার সহকর্মী, পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ীদের।


