Homeসারাদেশরামু ট্র্যাজেডির ১৪ বছর আজ

রামু ট্র্যাজেডির ১৪ বছর আজ

প্রতিবেদক : উচ্ছ্বাস বড়ুয়া।

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহারে হামলার সেই ভয়াল রাতের ১৪ বছর আজ। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া গুজবকে কেন্দ্র করে রামুর বৌদ্ধপল্লিতে নেমে এসেছিল ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ১২টি বৌদ্ধবিহার ও ২৬টি বসতঘর। ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় শত বছরের পুরোনো বৌদ্ধ স্থাপনা, মূর্তি ও ধর্মীয় নিদর্শন।

সময়টা ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি ছবি বৌদ্ধ যুবক উত্তম কুমার বড়ুয়ার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ট্যাগ করা হয়েছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে রামুতে। সেই গুজবকে কেন্দ্র করে রাতেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে একদল দুর্বৃত্ত রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়।

আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যায় ১২টি বৌদ্ধবিহার ও ২৬টি বসতঘর। ধ্বংস করা হয় বহু পুরোনো বৌদ্ধ মূর্তি, ধর্মীয় গ্রন্থ ও স্থাপনা। কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে রামুর শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা।

শুধু রামুতে থেমে থাকেনি সেই সহিংসতা। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফের আরও সাতটি বৌদ্ধবিহারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

গুজবের আগুনে পুড়েছিল সম্প্রীতি

পরবর্তী বিভিন্ন অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনে উঠে আসে, উত্তম কুমার বড়ুয়ার ফেসবুক অ্যাকাউন্টকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তিনি নিজে ওই ছবি পোস্ট করেননি, এমন বক্তব্যও তখন সামনে আসে। ঘটনার পর উত্তম বড়ুয়া নিখোঁজ হয়ে যান এবং এরপর গতবছর পরিবারের সাথে তার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেই ছবির সূত্র ধরে জানা যায় তিনি বর্তমানে ফ্রান্সে অবস্থান করছে।

একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া গুজব কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, রামুর ঘটনা তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হয়ে আছে।

সেদিনের কথা মনে পড়লে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকেরই আজও গা শিউরে ওঠে। সময় পেরিয়েছে ১৪ বছর। নতুন করে নির্মিত হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত বিহার ও ঘরবাড়ি। স্থাপনাগুলো আবারও নান্দনিক নির্মাণশৈলীতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আগুনে পোড়া স্মৃতি ও সেই রাতের আতঙ্ক অনেকের মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি।

১৪ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

রামু, উখিয়া ও টেকনাফের হামলার ঘটনায় মোট ১৮টি মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে ৪ টি মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছিল। বাকি ১৪টি মামলা এখনো স্বাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে। বিভিন্ন সময়ে এসব মামলায় প্রায় এক হাজার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এগোয়নি।

মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে সাক্ষীদের আদালতে হাজির না হওয়া বা সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহের বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রকৃত দোষীদের বিচার হওয়া জরুরি

বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের কক্সবাজার শাখার সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ মহাথের বলেন, ঘটনার ১৪ বছর পরও বৌদ্ধরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর মতে, মামলার প্রক্রিয়া আরও যাচাই-বাছাই করা জরুরি। নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত দোষীদের আসামি করে বিচারের আওতায় আনা যায় এমন ব্যবস্থা হলে তা দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ ইউনূছ দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকার রামুর ঘটনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তাঁর অভিযোগ, প্রকৃত আসামিদের বাদ দিয়ে বিরোধী মতের ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় চারটি মামলা প্রত্যাহার করা হলেও বাকি ১৪টি মামলা সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে।

ফিরেছে সম্প্রীতি, রয়ে গেছে ক্ষত

রামুর বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্তমানে সামাজিক সম্প্রীতি অনেকটাই ফিরে এসেছে। একই পাড়া-মহল্লায় বসবাস, সামাজিক অনুষ্ঠান ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন মানুষ।

কিন্তু ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের রাতটি ইতিহাসের একটি গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।

হারিয়ে যাওয়া স্থাপনা আবার নির্মিত হয়েছে, পোড়া বিহারগুলো নতুন রূপ পেয়েছে, মানুষের জীবনও ফিরেছে স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু ১৪ বছরেও বিচার শেষ না হওয়া নতুন করে প্রশ্ন তুলছে সেই ভয়াবহ হামলার প্রকৃত দায়ীদের বিচার কবে শেষ হবে?

রামুর মানুষ চান, অতীতের সেই বিভীষিকা আর কখনো ফিরে না আসুক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে অটুট থাকুক পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্প্রীতির বন্ধন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments