বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনি একজন অসহায় শারীরিক প্রতিবন্ধী। দুই পা অবশ, চলাফেরার একমাত্র ভরসা হুইলচেয়ার কিংবা অন্যের সাহায্য। কিন্তু এই শারীরিক অক্ষমতার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর অপরাধ জগতের মাস্টারমাইন্ড। নাম তার ছৈয়দুল হক। টেকনাফ ও কক্সবাজার উপকূলে যিনি পরিচিত এক আতঙ্কের নাম। অবশেষে পুলিশের এক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে অবসান ঘটেছে এই ‘পাচার সম্রাটের’ রাজত্বের।
কক্সবাজারের খুনিয়াপালং ইউনিয়নের কমুনিয়া এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ মানবপাচারের নথি ও সিসিটিভি ক্যামেরাসহ তাকে গ্রেপ্তার করেছে রামু থানা পুলিশ।
অপরাধের ছক: টার্গেট যখন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গত কয়েক বছরে টেকনাফ উপকূলকেন্দ্রিক যে আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম শীর্ষ নিয়ন্ত্রক এই ছৈয়দুল। তার সিন্ডিকেটের জাল বিস্তৃত ছিল দেশের কয়েকটি অঞ্চলসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও।
কৌশল: মালয়েশিয়ায় সুদিনের স্বপ্ন দেখিয়ে অসহায় মানুষ ও রোহিঙ্গাদের টার্গেট করা হতো।
বাণিজ্য: বিদেশ পাঠানোর নামে হাতিয়ে নেওয়া হতো কোটি কোটি টাকা।
ঝুঁকি: ট্রলারে করে সাগরপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাধ্য করা হতো ভুক্তভোগীদের, যার শেষ পরিণতি হতো অনেকের গুম বা মৃত্যু।
সিসিটিভি দুর্গে বিলাসবহুল জীবন
একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনযাপন ও বিপুল সম্পদ দেখে খোদ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও স্তম্ভিত। খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক জানান, ছৈয়দুলের রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাট। চলতেন দামি গাড়িতে।
সবচেয়ে রহস্যজনক ছিল তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিজের আস্তানা ও আশপাশের সড়কজুড়ে তিনি বসিয়েছিলেন অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা। আড়াল থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেই এই কড়া নিরাপত্তা দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
আইনের জালে ‘মাস্টারমাইন্ড’
রামু থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ছৈয়দুলের বিরুদ্ধে শুধু মানবপাচারই নয়, গুম ও খুনের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
”প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে অন্তত ৫টি মানবপাচারের মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তিনি একাধিক নাম ব্যবহার করায় অন্যান্য মামলার রেকর্ডও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”
টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মৃত কবির আহমদের ছেলে ছৈয়দুল হককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই গ্রেপ্তারের পর উপকূলের সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।


