Homeঅপরাধ ও দুর্নীতিচোরাইপথে আসছে গরু, কপালে ভাঁজ খামারিদের

চোরাইপথে আসছে গরু, কপালে ভাঁজ খামারিদের

এন.এ সাগর, কক্সবাজার :

পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কক্সবাজার-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত। মিয়ানমারের চলমান অস্থিরতাকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে গরু চোরাকারবারি চক্র। এতে একদিকে চাঙা হচ্ছে চোরাচালান সিন্ডিকেট, অন্যদিকে বৈধ খামারিরা পড়েছেন বড় ধরনের লোকসানের শঙ্কায়।

এরই মধ্যে কক্সবাজারের রামুতে মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে আনা সাতটি গরুসহ একটি ট্রাক জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রামু থানা পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল ৯টার দিকে রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা সওদাগরপাড়া এলাকায় গর্জনিয়া-রামু সড়কে অভিযান চালানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রামু থানার এসআই নিক্সন চৌধুরীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে গরুবাহী একটি ট্রাক আটক করে। পরে ট্রাক তল্লাশি করে সাতটি গরু জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- আয়াজ উদ্দিন রুবেল (৪০), শমছুল আলম (৩১), মাহাবুব আলম (৩০), মতিউর রহমান (৩৫) ও ওবাইদুল হক (২৭)। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন, গরুগুলো মিয়ানমার থেকে কম দামে এনে সরকারি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রবেশ করানো হয়েছে।

স্থানীয়দের তথ্য মতে, বর্তমানে রামুর গর্জনিয়া ও বান্দরবনের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের অন্তত ৮ থেকে ১২টি পয়েন্ট কার্যত “ওপেন রুটে” পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে তুমব্রু, ফুলতলী, কোনারপাড়া, মংজয়পাড়া, চাকঢালা, জামছড়ি ও বাইশারী সংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তপথ এখন চোরাকারবারিদের নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থানীয় সমাজকর্মী সাঈদ উদ্দিন বলেছেন, “রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে চোরাচালান কাফেলা। পাহাড়ি ছড়া, বনপথ, খাল ও অরক্ষিত সীমান্ত ব্যবহার করে শত শত বাহক সীমান্ত অতিক্রম করছে। নারী ও কিশোরদেরও বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ কম হয়। কেউ গরু নিয়ে আসে, কেউ সার নিয়ে যায়, আবার কেউ মাদক বহন করে।”

সীমান্তবাসীদের দাবী, ঈদুল আজহা সামনে রেখে ইতোমধ্যে শত শত বার্মিজ গরু বিভিন্ন গোপন রুট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এসব গরুর বড় অংশ কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ফেনীর পশুর হাটে বিক্রি হচ্ছে।

গত ৭ মে মংজয়পাড়া সীমান্তে বিজিবি তিনটি গরু জব্দ করলেও স্থানীয়দের মতে, সেটি ছিল ছোট চালান। প্রকৃতপক্ষে সীমান্তজুড়ে আরও বড় সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।

চোরাই গরুর অনুপ্রবেশে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বৈধ খামারিরা। কারণ, গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে সীমান্ত দিয়ে কম দামে বার্মিজ গরু ঢুকলে বাজারে দেশি গরুর দাম কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বর্তমানে ৮ হাজার ২৮৭টি খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৩টি পশু। জেলার সম্ভাব্য চাহিদা ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৯২টি। অর্থাৎ প্রায় ২৪ হাজার ৭৭১টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে।

প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৮৭৪টি গরু, ৬ হাজার ২৭৯টি মহিষ, ৩৩ হাজার ৫৫২টি ছাগল ও ১৪ হাজার ৪৬৩টি ভেড়া।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খামারি নুরুল হক শংকা জানিয়ে বলেছেন, “ভুষি-খৈলের যে দাম, তাতে ছোট খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন। এখন যদি সীমান্ত দিয়ে কম দামে গরু আসে, তাহলে আমরা বড় লোকসানে পড়ব।”

রামুর তরুণ উদ্যোক্তা আরিফ উল্লাহর ভাষ্য, “একটা গরু মোটাতাজা করতে যে খরচ হয়েছে, তাতে ন্যায্য দাম না পেলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই বসে থাকতে হবে।”

উখিয়ার প্রান্তিক খামারি রমিজ দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “গো-খাদ্যের দাম আর সংসারের চাপ সামলাতে না পেরে আগেই কয়েকটা গরু লোকসানে বিক্রি করেছি। এখন চোরাই গরু বাজারে এলে আমাদের শেষ হয়ে যেতে হবে।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি ভুট্টার গুঁড়া ৪৫-৫০ টাকা, গম ভাঙা ৫২-৫৫ টাকা, গমের ভুষি ৫৮-৬৫ টাকা এবং খৈল ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২৫ কেজির এক বস্তা ক্যাটল ফিড কিনতে খামারিদের গুণতে হচ্ছে ১১০০ থেকে ১৩০০ টাকা।

এদিকে ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম দাবি করেছেন, “সীমান্তে চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যেখানেই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই অভিযান চালানো হচ্ছে।”

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এম খালেকুজ্জামান জানান, “জেলায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। চোরাই পথে বাজারে গরু ঢুকলে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে।”

অন্যদিকে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন, সাদা পোশাকের পুলিশ ও বিশেষ টহল টিম মাঠে থাকবে।

তার দাবি, চোরাই গরু আনার পথগুলোতে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার আটক পাঁচ পাচারকারীর বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে। তাদের রিমান্ডে এনে পাচার চক্রের মূল হোতাদের শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ।

তবে কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের প্রশ্ন, বারবার অভিযান হলেও মূল সিন্ডিকেট প্রধানরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে কেন?

তার মতে, ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত আবারও মাদক, চোরাই গরু ও বহুমুখী পাচারের “অঘোষিত করিডোরে” পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments