Homeঅপরাধ ও দুর্নীতিঈদ সামনে, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে চোরাচালানের রমরমা: মাদক, গবাদিপশু ও পণ্যের অবৈধ করিডোরে...

ঈদ সামনে, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে চোরাচালানের রমরমা: মাদক, গবাদিপশু ও পণ্যের অবৈধ করিডোরে বাড়ছে শঙ্কা

বিশেষ প্রতিবেদক :

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত। দুর্গম সীমান্তপথ ব্যবহার করে প্রতিদিন বাংলাদেশে ঢুকছে মিয়ানমারের ইয়াবা, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ এবং গবাদিপশুর চালান। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সার, ভোজ্যতেল, ঔষধ, ডিম, খাদ্যপণ্য, মোটরসাইকেল, কসমেটিকস ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশসহ শতাধিক ধরনের পণ্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রামুর গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ এবং নাইক্ষ্যংছড়ির সদর, দোছড়ি ও ঘুমধুম ইউনিয়নকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক চোরাকারবারির সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। বিশেষ করে রাতের আঁধারে পাহাড়ি পথ, খাল, ছড়া ও গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে চলছে অবৈধ বাণিজ্যের বিস্তার।

সীমান্তে ‘ওপেন রুট’, বাড়ছে অবৈধ করিডোর : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্তে গবাদিপশু ও মাদক পাচার কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তুমব্রু, ফুলতলী, কোনারপাড়া, মংজয়পাড়া, রেইক্ষ্যাশিয়া পোস্ট, চাকঢালা, জামছড়ি ও বাইশারী সংলগ্ন অন্তত ৮ থেকে ১০টি পয়েন্ট এখন চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট আলাদাভাবে মাদক, গবাদিপশু, সার ও ঔষধ পাচার নিয়ন্ত্রণ করছে। একটি পক্ষ বাংলাদেশি খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী মিয়ানমারে পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, আইস ও গরুর চালান এনে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছে।

রাত নামলেই সক্রিয় চোরাকারবারিরা : একাধিক সীমান্তবাসী জানান, রাত হলেই পাহাড়ি পথজুড়ে শুরু হয় মালামাল বহনের প্রতিযোগিতা। কখনো শ্রমিক, কখনো কৃষকের ছদ্মবেশে শত শত বাহক সীমান্ত অতিক্রম করছে। জনপ্রতি দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে এসব পণ্য বহনের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফলে অভিযান হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মংজয়পাড়ায় গরুর চালান জব্দ : স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার ভোরে ঘুমধুম ইউনিয়নের মংজয়পাড়া সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে গবাদিপশুর বড় চালান বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করা হয়। পরে কোটবাজার ও মরিচ্যা পশুর হাটে নেওয়ার পথে ৩৪ বিজিবির সদস্যরা তিনটি গরু জব্দ করে।

বিজিবির দাবি, চলতি মৌসুমে এটি ওই পয়েন্টে প্রথম বড় গরুর চালান হলেও সীমান্তজুড়ে আরও বড় সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ঈদকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে শত শত গরু বিভিন্ন গোপন রুট ব্যবহার করে দেশে ঢুকেছে, যার বড় অংশ কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ফেনীর পশুর হাটে বিক্রি হচ্ছে।

বিজিবির ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ : গত মঙ্গলবার রাতে ঘুমধুম সীমান্তের তুমব্রু এলাকার কোনারপাড়া পয়েন্ট দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি পণ্য মিয়ানমারে পাচারের সময় বাধা দেয় বিজিবি। এ সময় সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্ধকারে নিজেদের লোকের আঘাতে আশরাফুল নামে একজন আহত হন।

এর আগেও গত বছরের ৯ মার্চ ফুলতলী বিওপির রেইক্ষ্যাশিয়া পোস্ট এলাকায় বিজিবির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ল্যান্স নায়েক রাজু ও সিপাহি শরিফ আহত হন এবং মামলা দায়ের করা হয়।

কাঁটাতারের ফাঁকে ‘খোলা সীমান্ত’ : স্থানীয়দের দাবি, কোনারপাড়া পয়েন্টে তুমব্রু খালের অগভীর পানি পেরোলেই মিয়ানমার সীমান্ত। ওই অংশে বাংলাদেশের কাঁটাতারের বেড়া না থাকলেও মিয়ানমারের পুরোনো বেড়ার বিভিন্ন অংশ কেটে সরু পথ তৈরি করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো।

মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিরা নির্বিঘ্নে পণ্য আনা-নেওয়া করছে।

একজন সীমান্তবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনে সীমান্ত শান্ত থাকে, কিন্তু রাত হলেই পাহাড়ি পথে মানুষের সারি দেখা যায়। কেউ সার নিয়ে যায়, কেউ গরু আনে, আবার কেউ মাদক বহন করে।

সম্প্রতি গর্জনিয়া বাজার এলাকায় একটি ঔষধবাহী গাড়ি থেকে পাচারের সময় তিনজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হলেও মূল হোতারা পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঔষধ পাচারে সক্রিয় চক্র: স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, নাইক্ষ্যংছড়ি ও আশপাশের বাজার থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ ঔষধ মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন ফার্মেসি ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব ঔষধ সংগ্রহ করে গোপন সীমান্তপথে পাচার করছে।

বাড়ছে ইয়াবা ও ‘আইস’ আতঙ্ক : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবার পাশাপাশি ভয়ংকর মাদক ‘আইস’ সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। উচ্চমূল্যের এই মাদক দেশের বড় শহরগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারিরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, বনাঞ্চল ও ছড়াকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী ও কিশোরদেরও বাহক হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম পিএসসি, পিবিজিএম বলেন,
“সীমান্তে চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যেখানেই চোরাচালানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, “চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

ঈদ ঘনালেই বাড়ছে শঙ্কা : স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, সীমান্তে গবাদিপশু ও মাদক চোরাচালান তত ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। তাদের মতে, দ্রুত সমন্বিত অভিযান, নতুন চেকপোস্ট স্থাপন, গোপন রুট বন্ধ এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা না বাড়ালে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত আবারও বড় অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন মনিটরিং, স্থানীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ এবং সীমান্তবাসীদের সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments